বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই একটি কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো প্রান্তিক কৃষক। কিন্তু অতি সম্প্রতি ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ৩০ বছর মেয়াদী যে বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তা বিশ্লেষণ করলে একে বাণিজ্যের চেয়ে আমাদের কৃষকদের জন্য একটি ‘মৃত্যুপরোয়ানা’ বলে মনে হয়। যে সরকারের মেয়াদ মাত্র কয়েক মাস, তারা কীভাবে আগামী তিন দশকের জন্য দেশের কৃষি ও সার্বভৌমত্বকে একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের কাছে বন্ধক রাখতে পারে? এই প্রশ্নটি এখন প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
এই চুক্তির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো আমদানির বাধ্যবাধকতা। প্রতি বছর প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে গম, সয়াবিন ও তুলা। প্রশ্ন হলো, আমাদের দেশ যখন অনেক কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে, তখন কেন জোর করে বিদেশি পণ্যের বাজার হতে আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে? আন্তর্জাতিক বাজারে অন্য দেশ থেকে সস্তায় পণ্য পাওয়ার সুযোগ থাকলেও আমরা এখন এই চুক্তির দোহাই দিয়ে চড়া দামে মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্য থাকব। এটি কেবল মার্কিন কৃষকদের পকেট ভরার একটি আয়োজন ছাড়া আর কিছুই নয়।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন দুগ্ধজাত পণ্য এবং মাংস কোনো গুণগত পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি বাংলাদেশের বাজারে ঢুকবে। গত কয়েক দশকে আমাদের দেশের হাজার হাজার তরুণ খামার করে দুগ্ধ ও পোল্ট্রি শিল্পে যে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছিল, এই এক সিদ্ধান্তে তা ধ্বংস হয়ে যাবে। মার্কিন সরকারের বিপুল ভর্তুকি পাওয়া পণ্যের সাথে আমাদের প্রান্তিক খামারিরা কখনোই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। এটি জেনেশুনেই আমাদের দেশীয় শিল্পকে বিদেশের চারণভূমিতে পরিণত করার এক আত্মঘাতী পরিকল্পনা।
সবচেয়ে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে ‘জিএমও’ বা ল্যাবরেটরিতে তৈরি বীজ নিয়ে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মার্কিন সংস্থাগুলো যে বীজকে নিরাপদ বলবে, আমাদের তা বিনাবাক্যে মেনে নিতে হবে। এতে আমাদের নিজস্ব ও প্রাকৃতিক বীজ ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। একবার মার্কিন কোম্পানিগুলোর পেটেন্ট করা বীজের ওপর আমাদের কৃষকরা নির্ভরশীল হয়ে পড়লে, বীজের জন্য আমাদের সারা জীবন তাদের মর্জির ওপর বেঁচে থাকতে হবে। আমাদের উর্বর সোনার মাটিতে এই ভিনদেশি বিষ ঢেলে দেওয়ার অধিকার এই সরকারকে কে দিয়েছে?
শুধু কৃষি নয়, এই চুক্তি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বা চীনের সাথে বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে এখন আমাদের ওয়াশিংটনের অনুমতি নিতে হবে। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেন অন্য কোনো দেশের হাতে থাকবে? ডিজিটাল বাণিজ্যের নামে মার্কিন টেক জায়ান্টদের ওপর ট্যাক্স বসানোর ক্ষমতাও আমরা হারিয়েছি।
নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে এমন একটি গোপন ও অসম চুক্তি করার তাড়াহুড়ো প্রমাণ করে যে, সরকার জানত এটি জনস্বার্থ বিরোধী। ড. ইউনূস এবং তার অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তির মাধ্যমে দেশকে দীর্ঘমেয়াদী পরাধীনতার শিকলে বেঁধে দিয়েছে। আমাদের কৃষকদের ঘাম আর শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত অর্থনীতিকে এভাবে পরনির্ভরশীল করার পরিণাম হবে ভয়াবহ। ইতিহাস কখনোই এই দেশবিরোধী তোষণ নীতিকে ক্ষমা করবে না।