ইতিহাসের এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি দেখছে বাংলাদেশ। ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেভাবে বাণিজ্যের অনুমতি নিয়ে এসে ধীরে ধীরে পুরো বাংলা দখল করে নিয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা এই ৩০ বছরের ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ ঠিক সেই স্মৃতিই মনে করিয়ে দিচ্ছে। বাণিজ্যের ঝকঝকে মোড়কে ঢাকা এই চুক্তিটি আসলে কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রকে পরোক্ষভাবে মার্কিন উপনিবেশে পরিণত করার এক সুগভীর ষড়যন্ত্র। যে চুক্তিতে দেশের মানুষের লাভ নয়, বরং বিদেশের প্রভুদের তুষ্ট করাই মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি অন্তর্বর্তী সরকার যার দায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক মাসের জন্য দেশ চালানো, তারা কোন সাহসে আগামী ৩০ বছরের জন্য পুরো জাতির ভাগ্য একটি নির্দিষ্ট দেশের হাতে বন্ধক রাখল? এই চুক্তির প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে পরাধীনতার বিষ। প্রতি বছর প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার বাধ্যবাধকতা আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মানে হলো, আমরা এখন থেকে আর আমাদের নিজের ইচ্ছেমতো সস্তা বাজার থেকে গম বা সয়াবিন কিনতে পারব না। আমাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা এখন থেকে সরাসরি মার্কিন খামারিদের পকেটে যাবে, আর আমাদের দেশি কৃষকরা তাদের পণ্যের ন্যায্য দাম না পেয়ে পথে বসবে। এটি কি সেই নীলকরদের আমলের ‘নীল চাষ’ এর আধুনিক রূপ নয়?
সবচেয়ে আপত্তিকর বিষয় হলো আমাদের ভূ-রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব বিসর্জন। চুক্তির ধারা অনুযায়ী, আমেরিকা যদি কাউকে তাদের শত্রু মনে করে, তবে আমরা তাদের সাথে ব্যবসা করতে পারব না। অর্থাৎ রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় তেল আনা কিংবা চীনের সাথে আমাদের ২৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করার অধিকার এখন ওয়াশিংটনের মর্জির ওপর নির্ভর করবে। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতি কেন হোয়াইট হাউসের টেবিলে বসে নির্ধারিত হবে? এটি কি সরাসরি উপনিবেশবাদের লক্ষণ নয়?
- ৩০ বছরের দীর্ঘ চুক্তিতে জাতীয় সার্বভৌমত্ব বন্ধক।
- সস্তায় পণ্য কেনার স্বাধীন বাণিজ্য ক্ষমতা হারানো।
- মার্কিন শস্যের আধিপত্যে দেশীয় কৃষি ধ্বংসের আয়োজন।
- রাশিয়া ও চীনের সাথে ব্যবসায় মার্কিন খবরদারি।
- নির্বাচনী ম্যান্ডেট ছাড়াই ভয়াবহ এক দাসের দলিল।
- ডিজিটাল ট্যাক্স ও ঔষধ শিল্পের নিয়ন্ত্রণ হারানো।
চুক্তিটিতে ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার যে চাপ দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের জাতীয় এয়ারলাইন্স ‘বিমান’কে দেউলিয়া করার এক চূড়ান্ত পরিকল্পনা। যেখানে সারা বিশ্বে বোয়িংয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, সেখানে বাংলাদেশ কেন সেই বাতিল পণ্য কেনার আস্তাকুঁড়ে পরিণত হলো? এছাড়া মার্কিন দুগ্ধজাত পণ্য ও মাংস কোনো গুণগত পরীক্ষা ছাড়াই বাজারে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছে। এর ফলে আমাদের দেশি পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। আমাদের খামারিরা যখন না খেয়ে মরবে, তখন আমাদের ভাতের থালায় সাজানো থাকবে মার্কিন জিএমও বিষ।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ঔষধ শিল্পের নিয়ন্ত্রণ হারানো। আমাদের সাইবার আইন থেকে শুরু করে ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ, সবই এখন মার্কিন গাইডলাইন অনুযায়ী চলবে। এর মানে হলো, আমরা আর আমাদের নিজের আইন দিয়ে নিজেদের বাজার রক্ষা করতে পারব না। গুগল-ফেসবুকের মতো কোম্পানিগুলো আমাদের দেশ থেকে টাকা নিয়ে যাবে কিন্তু আমরা তাদের ওপর ট্যাক্স বসাতে পারব না।
নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ড. ইউনূসের সরকার এই ‘গোলামির দলিল’ সই করেছে। এটি জাতির সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা। যারা নিজেদের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের রক্ষক দাবি করেন, তারা আসলে বাণিজ্যের আড়ালে দেশকে একবিংশ শতাব্দীর এক নতুন পরাধীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। আমাদের উর্বর মাটি আর পরিশ্রমী কৃষকদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে তৈরি করা এই ‘নতুন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র শাসন বাংলার মানুষ কখনোই মেনে নেবে না। সময় এসেছে এই আত্মঘাতী চুক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর।