একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কাজ হলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা বুঝিয়ে দেওয়া। এই সরকারের কোনো স্থায়ী ম্যান্ডেট নেই, নেই কোনো বড় নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনি অধিকার। কিন্তু অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ৩০ বছর মেয়াদী একটি ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ সই করেছে। এই চুক্তিটি গভীরভবে পর্যবেক্ষণ করলে একে বাণিজ্যের চেয়েও বেশি একতরফা পরাধীনতার দলিল বলে মনে হয়। প্রশ্ন জাগে, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে কেন এমন তড়িঘড়ি? কেন দেশের ভবিষ্যৎ এভাবে কয়েক দশকের জন্য বন্ধক রাখা হলো?
চুক্তিটির সবচেয়ে আপত্তিকর দিক হলো এর সময়কাল এবং গোপনীয়তা। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতিকে ৩০ বছরের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের ইচ্ছাধীন করে দেওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। যে চুক্তি আগামী কয়েক দশকের জন্য দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে কোনো জনসমক্ষে আলোচনা হয়নি। তথাকথিত ‘নন-ডিসক্লোজার’ বা গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে এই দাসের দলিলকে আড়াল করা হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে এই চুক্তির ঘোষণা আসার মানেই হলো, সরকার জানত যে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত কোনো সংসদ এই অসম চুক্তি কখনোই অনুমোদন করত না।
নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে দেশের গলায় ৩০ বছরের গোলামির শিকল পরিয়ে দেওয়া কেবল রাজনৈতিক হঠকারিতা নয়; এটি আঠারো কোটি মানুষের ভবিষ্যতের ওপর এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার চুরিকাঘাত।
চুক্তির ধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেশের অর্থনীতির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। প্রতি বছর অন্তত সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার বাধ্যবাধকতা আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ সয়াবিন, গম আর তুলা কেন আমাদের নির্দিষ্টভাবে আমেরিকা থেকেই কিনতে হবে? যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অন্য দেশ থেকে কম দামে এই পণ্যগুলো পাওয়া যায়, তবুও কি আমাদের এই চড়া মূল্যের মার্কিন পণ্যই কিনতে হবে না? এটি স্বাধীন বাণিজ্যের অধিকারকে সরাসরি গলা টিপে হত্যা করার শামিল। এই বিশাল অংকের ডলার জোগাড় করতে গিয়ে আমাদের রিজার্ভের ওপর যে টান পড়বে, তার চাপ সরাসরি পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে।
সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে আমাদের দেশীয় কৃষিখাতে। চুক্তিতে পরিষ্কার বলা আছে, আমেরিকার দুগ্ধজাত পণ্য এবং মাংস কোনো রকম গুণগত মান যাচাই বা ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি বাংলাদেশের বাজারে ঢুকবে। এমনকি তাদের পণ্যের জন্য বিশেষ কোনো লাইসেন্স বা নিবন্ধনের প্রয়োজনও পড়বে না। যখন মার্কিন সরকারের ভর্তুকি পাওয়া সস্তা গুঁড়ো দুধ আর মাংস আমাদের বাজার দখল করবে, তখন আমাদের তিল তিল করে গড়ে ওঠা দেশি ডেইরি ও পোল্ট্রি শিল্প কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? গত কয়েক দশকে হাজার হাজার শিক্ষিত যুবক খামার করে যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, এই চুক্তির ফলে তারা স্রেফ ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের কৃষকরা নিজেদের মাটিতেই ভিনদেশি পণ্যের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়বে।
জিএমও বা জেনেটিক্যালি মডিফাইড পণ্যের বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। চুক্তির অনুচ্ছেদ ১.৬ অনুযায়ী, আমেরিকার সরকার যেসব বীজ বা খাবারকে নিরাপদ বলবে, আমাদের চোখ বন্ধ করে তা মেনে নিতে হবে। মাত্র ২৪ মাসের মধ্যে আমাদের এমন আইন করতে হবে যা মার্কিন ল্যাবে অনুমোদিত যে কোনো বীজকে আমাদের উর্বর মাটিতে প্রবেশের বৈধতা দেবে। এটি শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি নয়, বরং আমাদের আদি বীজ ব্যবস্থাকে চিরতরে বিলুপ্ত করার এক ষড়যন্ত্র। একবার যদি আমাদের কৃষকরা মার্কিনিদের পেটেন্ট করা বীজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তারা চিরকালের জন্য মার্কিন কোম্পানিগুলোর গোলামে পরিণত হবে।
শিল্প খাতের অবস্থাও তথৈবচ। আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক সুবিধার মুলা ঝোলানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে শর্ত দেওয়া হয়েছে যে কেবল মার্কিন তুলা বা সুতা ব্যবহার করলেই এই সুবিধা মিলবে। এর মানে হলো, আমাদের পোশাক শিল্পকেও এখন থেকে মার্কিন কৃষি খামারের লেজুড় হিসেবে চলতে হবে। অন্যদিকে, ১৪টি বিতর্কিত বোয়িং বিমান কেনার যে ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের জাতীয় এয়ারলাইন্সকে চূড়ান্ত লোকসানের মুখে ঠেলে দেবে। যখন বিশ্বের অনেক দেশ ত্রুটির কারণে বোয়িং কেনা বন্ধ করছে, তখন বাংলাদেশ কেন আমেরিকার এই ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ বা বাতিল মাল ফেলার আস্তাকুঁড় হতে যাচ্ছে?
সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটি হলো আমাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব। চুক্তির ৪.১ এবং ৪.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আমেরিকা যদি কোনো দেশকে তাদের শত্রু মনে করে, তবে বাংলাদেশ ওই দেশের সাথে স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করতে পারবে না। অর্থাৎ, আমাদের জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হলেও আমরা রাশিয়ার সাথে সরাসরি লেনদেন করতে পারব না, যদি না ওয়াশিংটন অনুমতি দেয়। এমনকি চীনের সাথে আমাদের যে বিশাল বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, তাও এখন মার্কিন মর্জির ওপর ঝুলে থাকবে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত কেন অন্য কোনো দেশের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর করবে?
ডিজিটাল বাণিজ্যের নামে আমাদের হাত-পা আরও শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। গুগল, ফেসবুকের মতো বিশাল মার্কিন কোম্পানিগুলো আমাদের দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করলেও আমরা তাদের ওপর কোনো ডিজিটাল ট্যাক্স বসাতে পারব না। এমনকি আমাদের সাইবার নিরাপত্তা আইনও করতে হবে মার্কিন গাইডলাইন অনুযায়ী। এটি কি কোনো স্বাধীন দেশের লক্ষণ হতে পারে, নাকি এটি সরাসরি একটি অর্থনৈতিক উপনিবেশে পরিণত হওয়ার আগাম সংকেত?
এই চুক্তিটি কোনোভাবেই বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে না। এটি কেবল নির্দিষ্ট একটি রাষ্ট্রকে খুশি করার এবং দেশের অর্থনীতিকে সুদূরপ্রসারী সংকটে ফেলার এক গভীর চক্রান্ত। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার যে নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে নির্বাচনের ঠিক আগে এই গোলামির শিকল দেশের মানুষের গলায় পরিয়ে দিয়েছে, তার জবাব একদিন অবশ্যই দিতে হবে। আমাদের কৃষক, আমাদের খামারি এবং আমাদের সার্বভৌমত্বকে এভাবে বিকিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। দেশের মানুষ যখন ভোট দিয়ে নতুন সরকার নির্বাচনের অপেক্ষায়, তখন এই গোপন ও আত্মঘাতী চুক্তি জাতির পিঠে ছুরিকাঘাতের শামিল। ইতিহাসের পাতায় এই হঠকারিতার দায়ভার থেকে ড. ইউনূস ও তার সরকার কখনোই মুক্তি পাবে না। জনগণের দাবি একটাই, এই অসম ও আত্মঘাতী চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অন্যথায় এই ৩০ বছরের গোলামির অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ আগামীর প্রজন্মের কাছে রুদ্ধ হয়ে যাবে।