Dhaka Reader
Nationwide Bangla News Portal

ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্রের মোড়কে নব্য ঔপনিবেশিকতা: ট্রাম্পের ‘গানবোট ডিপ্লোমেসি’ ও বিশ্বব্যবস্থার মৃত্যুঘণ্টা

মতামত ডেস্ক:

ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তিন দশক আগে পানামায় ‘অপারেশন জাস্ট কজ’-এর মাধ্যমে ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করার যে দৃষ্টান্ত যুক্তরাষ্ট্র স্থাপন করেছিল, ২০২৬ সালে এসে ভেনেজুয়েলায় তার চেয়েও ভয়াবহ পুনরাবৃত্তি দেখল বিশ্ববাসী। কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদ থেকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ভিনদেশি কমান্ডো দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই আইন প্রয়োগ হতে পারে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক দস্যুবৃত্তির নামান্তর।

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে যতই ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ বা ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করুন না কেন, এর পেছনের আসল উদ্দেশ্য কারো অজানা নয়। নিকোলাস মাদুরোকে আটকের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা এই অভিযানের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, এই যুদ্ধের রং রক্তের মতো লাল নয়, বরং তেলের মতো কালো।

ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পর ট্রাম্পের দম্ভোক্তি ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি রাখঢাক না রেখেই ঘোষণা দিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ এখন থেকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করবেন। এটি মূলত বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ দখল করার একটি নগ্ন প্রকল্প। ইরাক যুদ্ধের সময় যেমন গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অজুহাত দেওয়া হয়েছিল, ঠিক তেমনি ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ‘মাদক-রাষ্ট্র’ তকমা ব্যবহার করা হয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো কারাকাসের তেলকূপগুলোর চাবি নিজেদের পকেটে পোরা এবং সেখান থেকে চীনের প্রভাব বলয় চূর্ণ করা। আধুনিক অর্থনীতির পরিভাষায় একে ‘রিসোর্স গ্র্যাবিং’ বা সম্পদ লুটপাট ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না।

মাদুরোকে আটকের পর ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার অন্যান্য মন্ত্রীদের যেভাবে হুমকি দিচ্ছে, তা কোনো রাষ্ট্রনায়কোচিত আচরণ নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে দেওয়া বার্তাটি পরিষ্কার— হয় আমাদের পুতুল সরকারের সামনে মাথা নত করো, নয়তো মাদুরোর পরিণতি বরণ করো। এই ধরনের ব্ল্যাকমেইল কূটনৈতিক দেউলিয়াত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ, যা প্রমাণ করে ওয়াশিংটন কোনো রাজনৈতিক সমাধানে নয়, বরং পেশিশক্তিতে বিশ্বাসী।

এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এক অশনিসংকেত। আজ যদি ট্রাম্প প্রশাসন কোনো দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে খোদ প্রেসিডেন্টের শোবার ঘরে হানা দিতে পারে, তবে ভবিষ্যতে এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার অন্য কোনো দেশে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা নেই। চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর চোখের সামনে দিয়ে তাদের মিত্রকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং জাতিসংঘ এখানে কেবলই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির উগ্র রূপটি বিশ্বকে দেখালেন। প্রতিবেশী দেশগুলোকে ব্যবহার করা এবং গ্রিনল্যান্ড কেনার মতো অদ্ভুত আবদার প্রমাণ করে যে, বিশ্বটা তার কাছে একটি রিয়েল এস্টেট মার্কেট। ভেনেজুয়েলার পতন এবং সেখানে আমেরিকার এই নগ্ন হস্তক্ষেপ বিশ্বকে এমন এক জঙ্গলের আইনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে ন্যায়বিচারের চেয়ে মিসাইলের পাল্লা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস সাক্ষী, আগ্রাসন দিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করা গেলেও তা টিকিয়ে রাখা যায় না।

Leave A Reply

Your email address will not be published.