ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্রের মোড়কে নব্য ঔপনিবেশিকতা: ট্রাম্পের ‘গানবোট ডিপ্লোমেসি’ ও বিশ্বব্যবস্থার মৃত্যুঘণ্টা
তিন দশক আগে পানামায় ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্র যে ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ চালিয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে ভেনেজুয়েলায় তার চেয়েও ভয়ংকর ও নগ্ন পুনরাবৃত্তি দেখল বিশ্ব। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদ থেকে একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে (তা তিনি যতই বিতর্কিত হোন না কেন) ভিনদেশি কমান্ডো দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া কোনো ‘আইন প্রয়োগ’ নয়; এটি আন্তর্জাতিক দস্যুবৃত্তি।
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’ বা ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ বলে যতই মোড়কজাত করার চেষ্টা করুন না কেন, আসল সত্যটি তিনি নিজেই ফাঁস করে দিয়েছেন। মাদুরোকে আটকের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার ঘোষণা প্রমাণ করে -এই যুদ্ধের রং রক্তের মতো লাল নয়, বরং তেলের মতো কালো।
তেল: আগ্রাসনের আসল জ্বালানি:
ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পর ট্রাম্পের দম্ভোক্তি ছিল লক্ষণীয়। তিনি রাখঢাক না রেখেই বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ তিনি ‘নিয়ন্ত্রণ’ করবেন। এটি কোনো রাখঢাকহীন স্বীকারোক্তি যে, অপারেশনটি মূলত বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ দখল করার একটি প্রকল্প। ইরাক যুদ্ধের সময় যে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’র মিথ্যা অজুহাত দেওয়া হয়েছিল, ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সেই অজুহাত হলো ‘মাদক-রাষ্ট্র’। অথচ আসল লক্ষ্য কারাকাসের তেলকূপগুলোর চাবি নিজেদের পকেটে পোরা এবং চীনকে সেখান থেকে বিতাড়িত করা। একে আধুনিক অর্থনীতির ভাষায় ‘রিসোর্স গ্র্যাবিং’ বা সম্পদ লুটপাট ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না।
মাফিয়া স্টাইল ডিপ্লোমেসি
মাদুরোকে আটকের পর ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনোকে হুমকি দিচ্ছে, তা কোনো রাষ্ট্রনায়কোচিত আচরণ নয়; বরং এটি মাফিয়া ডনদের কার্যপদ্ধতিকে মনে করিয়ে দেয়। বার্তাটি পরিষ্কার- ‘হয় আমাদের পুতুল সরকারের (অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ) সামনে মাথা নত করো, নয়তো মাদুরোর পরিণতি বরণ করো।’ এই ধরনের ব্ল্যাকমেইল বা ভয় দেখিয়ে আনুগত্য আদায়ের চেষ্টা কূটনৈতিক দেউলিয়াত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ। এটি প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন কোনো সংলাপ বা রাজনৈতিক সমাধানে বিশ্বাসী নয়, তারা বিশ্বাসী কেবল পেশিশক্তিতে।
আন্তর্জাতিক আইনের মৃত্যু
ভেনেজুয়েলার এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এক অশনিসংকেত। আজ যদি ট্রাম্প প্রশাসন কোনো দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে খোদ প্রেসিডেন্টের শোবার ঘরে হানা দিতে পারে, তবে কাল অন্য কোনো অজুহাতে এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার অন্য কোনো দেশে একই ঘটনা ঘটাবে না- তার নিশ্চয়তা কে দেবে?
চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর চোখের সামনে দিয়ে তাদের মিত্রকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘ এখানে দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, যা সংস্থাটির অকার্যকারিতাকেই প্রকট করে তুলেছে।
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মানে ‘বাকিরা তুচ্ছ’
এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির চূড়ান্ত ও উগ্র রূপটি দেখালেন। এই নীতিতে মিত্রদের সার্বভৌমত্বের কোনো মূল্য নেই, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কোনো নিয়ম নেই। আছে শুধু আমেরিকার স্বার্থ। কলম্বিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোকে ব্যবহার করে এবং গ্রিনল্যান্ড কেনার মতো উদ্ভট আবদার করে তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, বিশ্বটা তার কাছে একটি রিয়েল এস্টেট মার্কেট, যেখানে সবকিছুরই দাম আছে এবং সবকিছুই তিনি গায়ের জোরে দখল করতে পারেন।
অন্ধকারের দিকে যাত্রা:
ভেনেজুয়েলার পতন এবং সেখানে আমেরিকার এই নগ্ন হস্তক্ষেপ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বিশ্বকে এমন এক জঙ্গলের আইনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে ন্যায়বিচারের চেয়ে মিসাইলের পাল্লা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প হয়তো সাময়িকভাবে তেলের প্রবাহ নিশ্চিত করেছেন, কিন্তু তিনি দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার নৈতিক অবস্থানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। ইতিহাস সাক্ষী, দম্ভ ও আগ্রাসন দিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করা যায়, কিন্তু টিকিয়ে রাখা যায় না। ভেনেজুয়েলার কান্না হয়তো কারাকাসের রাজপথে চাপা পড়ে যাবে, কিন্তু এই আগ্রাসনের প্রতিধ্বনি বিশ্ব রাজনীতির অলিগলিতে দীর্ঘকাল ধরে বাজবে সতর্কবার্তা হিসেবে।