আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান সরকারের অন্যতম নীতি-নির্ধারক ও প্রভাবশালী কূটনীতিক মোল্লা নুর আহমদ নুর (যিনি মোল্লা জাওয়ান্দি নামে পরিচিত) বর্তমানে অবস্থান করছেন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফার্স্ট পলিটিক্যাল ডিভিশনের এই মহাপরিচালক গত এক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো—সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই সফর সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নয় বলে দাবি করছে।
গোপনীয়তা ও রহস্যময় সফর:
গত ২১ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১২টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন মোল্লা জাওয়ান্দি। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান বাংলাদেশ-আফগানিস্তান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএসিসিআই) চেয়ারম্যান আবু সায়েম খালেদ। সফরের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা আফগান দূতাবাস থেকে এই সফরের উদ্দেশ্য বা প্রটোকল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, সাধারণত বিদেশি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সফরের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ আগে জানানো হয়, যা এক্ষেত্রে ঘটেনি। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট জানিয়েছে, তারা জাওয়ান্দির গতিবিধির ওপর নজর রাখছে।
রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক:
ঢাকায় অবস্থানকালে মোল্লা জাওয়ান্দি রাজধানীর ফরিদাবাদ মাদ্রাসা, মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া এবং নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার জামিয়া কারামিয়া মাদ্রাসা পরিদর্শন করেছেন। গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি হেফাজতে ইসলামের আলোচিত নেতা ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। যদিও মামুনুল হকের বড় ভাই মাওলানা মাহফুজুল হক বিষয়টিকে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর পেছনে গভীর কোনো কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন। উল্লেখ্য, গত সেপ্টেম্বর মাসেই মাওলানা মামুনুল হকসহ সাত আলেম আফগানিস্তান সফর করেছিলেন।
‘হুজি’ সংশ্লিষ্টতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি:
মোল্লা জাওয়ান্দির এই সফরকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) সাবেক ও বর্তমান সন্দেহভাজন নেতাদের সরব উপস্থিতি নিয়ে। গত শনিবার রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএসিসিআই আয়োজিত ‘ব্লুপ্রিন্ট অব দ্য ইসলামিক এমিরেট’ শীর্ষক একটি সমাবেশে জাওয়ান্দির উপস্থিত থাকার কথা ছিল। ওই সমাবেশে হুজির সাবেক আমির শেখ ফরিদের স্বজন এবং সংগঠনটির কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
আয়োজক আবু সায়েম খালেদ বর্তমানে হুজির নারায়ণগঞ্জ জেলা আমির হিসেবে পরিচিত থাকলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। তবে সমাবেশস্থলে আল-মারকাজুল ইসলামীর পক্ষ থেকে খাবার সরবরাহ এবং উগ্রপন্থী মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলছে।
ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপড়েন:
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন সফর অত্যন্ত স্পর্শকাতর। দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, আফগানিস্তানের সঙ্গে যেখানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই, সেখানে বাংলাদেশে একজন তালেবান নেতার অবাধ বিচরণ এবং রাজনৈতিক বৈঠকগুলো আন্তর্জাতিক মহলে ভুল বার্তা দিতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা এবং পাকিস্তানের বৈরিতা বিরাজমান। এমন পরিস্থিতিতে তালেবান প্রতিনিধিকে বাংলাদেশে আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেওয়া হলে তা পাকিস্তান-বাংলাদেশ ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জটিল সমীকরণকে আরও ঘোলাটে করতে পারে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে যেখানে বৈদেশিক সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ চলছে, সেখানে এই সফরকে ‘পরিকল্পিত পদক্ষেপ’ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
উদ্বেগের কেন্দ্রে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হত্যা:
সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর দেশে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে একজন বিতর্কিত বিদেশি কূটনীতিকের গোপনীয় সফর এবং উগ্রপন্থী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর মেলামেশা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, মোল্লা জাওয়ান্দির ঢাকা সফর কি কেবলই ধর্মীয় বা বাণিজ্যিক, নাকি এর পেছনে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কোনো ‘ইসলামিক ব্লকের’ ব্লুপ্রিন্ট রয়েছে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই সফর নিয়ে দ্রুত স্পষ্টীকরণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।