গাজীপুর প্রতিনিধি:
গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ীতে এক ব্যবসায়ীর চলমান কারখানা জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া, কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ এবং তাকে শারীরিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মো. গিয়াস উদ্দিন সিকদার গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) কমিশনার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মো. গিয়াস উদ্দিন সিকদার ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি কোনাবাড়ী থানাধীন জরুন এলাকায় অবস্থিত মো. সাইফুদ্দিন আহমেদ (সাজু)-এর একটি কারখানা ৬ বছরের জন্য ভাড়া নেন। জামানত হিসেবে তিনি ২০ লাখ টাকা প্রদান করেন। চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করে তিনি সফলভাবে কারখানাটি পরিচালনা করে আসছিলেন। কিন্তু ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় ফ্যাক্টরির মালিক ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন বলে দাবি ভুক্তভোগীর।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি গিয়াস উদ্দিনকে জোরপূর্বক ফ্যাক্টরির মেশিনারিজ, আসবাবপত্র, একটি পিকআপ ও দুটি গাড়ি প্রায় ৩৫ লাখ টাকায় কিনতে বাধ্য করা হয়। এত কিছুর পরও ভাড়া কমানো হয়নি; উল্টো আগের মতোই তাঁর কাছ থেকে ভাড়া আদায় করা হতে থাকে, যা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, অভিযুক্তরা একই ফ্যাক্টরির বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করলেও, মাসে গড়ে ৬০ হাজার টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল গিয়াস উদ্দিনের কাছ থেকেই জোর করে আদায় করত।পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায় ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। ওই দিন অভিযুক্তরা জোরপূর্বক কারখানায় প্রবেশ করে গিয়াস উদ্দিনকে অবরুদ্ধ করে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে এবং চলমান উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এমনকি শিপমেন্ট চলাকালীন কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় বিদেশি বায়ারের কাছ থেকে ১৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা গ্রহণ করে অভিযুক্তরা এবং ১০-১২ হাজার পিস সোয়েটারসহ প্রায় ১০ লাখ টাকার মালামাল আটকে রাখে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী গিয়াস উদ্দিনের প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে শ্রমিকদের ওপর; কারখানাটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৩০০ শ্রমিক একযোগে কর্মহীন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে বিষয়টি থানায় জানানো হলে তৎকালীন ওসির নির্দেশে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আরিফ খন্দকার ও তাঁর সহযোগী রফিক পালোয়ান ভুক্তভোগীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক একটি আপসনামায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ লাখ টাকার জামানত থেকে ১৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরে গাড়ি বিক্রি করে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাওয়া গেলেও এর অধিকাংশ টাকাই আত্মসাৎ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী জানান, তিনি অগ্রিম মাত্র ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন, বাকি ১৫ লাখ টাকা আরিফ খন্দকার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাকে মাত্র ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা ফেরত দিয়ে বাকি প্রায় ১১ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
এই পাওনা টাকা ফেরত চাইতে গেলে ভুক্তভোগীকে হত্যার হুমকিসহ এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। এ সংক্রান্ত একটি অডিও কল রেকর্ড এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
এছাড়া ফ্যাক্টরির মালিক সাইফুদ্দিন আহমেদ (সাজু)-এর বিরুদ্ধেও প্রতারণার অভিযোগ তুলে ভুক্তভোগী দাবি করেন, তাঁর ব্যক্তিগত মালামাল এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি এবং চুক্তি ভঙ্গ করে অর্ধকোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ছয় মাস ধরে ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকায় গিয়াস উদ্দিন দেড় কোটিরও বেশি টাকার চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে না পেরে তিনি এখন চরম মানবিক সংকটে পড়েছেন।
আবেগঘন কণ্ঠে ভুক্তভোগী গিয়াস উদ্দিন বলেন, “আমি এখন এমন এক চরম অবস্থায় পৌঁছেছি যে, আমার ন্যায্য পাওনা ফেরত না পেলে আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।”
তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, আত্মসাৎকৃত ১১ লাখ টাকা উদ্ধার, বকেয়া ১৬ লাখ টাকা আদায়, কারখানায় আটকে থাকা ব্যক্তিগত মালামাল ফেরত এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি নিজের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আরিফ খন্দকার অর্থ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “আমার কাছে ৬ লাখ টাকা আছে, বাকি ৫ লাখ টাকা রফিক পালোয়ান নিয়েছে।”
সার্বিক বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার বলেন, “ভুক্তভোগীর অভিযোগটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখছি। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এ ঘটনায় পুরো কোনাবাড়ী এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচার না হলে এমন ঘটনা ব্যবসায়ী সমাজে একটি ভয়াবহ ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।